টাকা কার, কে নিলো, কোথায় গেলো? - all-banglanews
ঢাকা। শুক্রবার, ৫ আশ্বিন, ১৪২৬; ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯; ১৯ মুহাররম, ১৪৪১
হোম / মতামত / টাকা কার, কে নিলো, কোথায় গেলো?

টাকা কার, কে নিলো, কোথায় গেলো?

 আবদুল মান্নান
আবদুল মান্নান

‘সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে’-এক সপ্তাহের কম ব্যবধানে দু’টি সংবাদ মানুষকে পিলে চমকে দিয়েছে। প্রথম খবরটি গত শনিবার, ৫ জুন জাতীয় সংসদে বর্তমান সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংসদকে অবহিত করেন বাংলাদেশে ঋণখেলাপিদের কাছে বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে দু’টি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। তাদের কাছ থেকে পাওনা ১২০০ কোটি টাকার সুদও আবার মাফ করে দেওয়া হয়েছে এক বছরে। এই সংবাদের রেশ না কাটতেই আবার ২৮ জুন শুক্রবার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৫৩৪৩ কোটি টাকা বা ৬১৭.৭৩ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। এক বছরে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ বেড়েছে এক হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। আগের বছরের শেষে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪০৬৯ কোটি টাকা। এই তথ্য প্রকাশ করেছে সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশ চলতো অন্য দেশের সাহায্য সহায়তার ওপর। বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বাস করে অনেক দেশ ও দাতা সংস্থা বাংলাদেশকে পণ্য ও নগদ সাহায্যও দিতো। বিদেশ থেকে কোনও কিছু ক্রয় করার অর্থ তখন ছিল না। এক সময় পূর্ব ইউরোপের কোনও কোনও দেশের সঙ্গে প্রাচীন ব্যবস্থা পণ্য বিনিময় (বাট্রার) ব্যবস্থাও চালু হয়েছিল। তখনও কালোবাজারিরা দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ পাচার করতো। তবে সেটার পরিমাণ এত ভয়াবহ পরিমাণের ছিল না। দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার বর্তমানে মহামারী আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশি বাঙালিদের সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারের খবরটা চাউর হওয়ার পর মিডিয়ায় এই বিষয়ে তেমন একটা আলাপ-আলোচনা নেই। যা কিছু সামান্য আছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি নিয়ে কিছুটা হলেও আলোচনা ছিল। টিআইবি বা সিপিডিও এই বিষয়ে সক্রিয় নয়। দেশের সুশীল সমাজ তো সব সময় সবকিছুতেই রহস্যময় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাভাষায় একটা প্রবাদ আছে, ‘টাকা দিলে বাঘের দুধও পাওয়া যায়’। সম্ভবত ব্যতিক্রম শুধু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে। মনে হয় এসব সুশীল সব সময় আওয়ামী লীগের দিকে দুরবিন তাক করে থাকেন। আর আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীও নিত্য চেষ্টা করে তাদের আলোচনা-সমালোচনার খোরাক জোগাতে। দেশের একটি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষককে বলতে দেখলাম- সুইস ব্যাংককে জমা হওয়া সব অর্থ কালো টাকা নয়। তার মতে- অনেকে তাদের বৈধ অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা রাখেন, কারণ দেশের ব্যাংকে জমা রাখলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কর দিতে হয়, দেশের বাইরে কোনও কারণে তা নিতে হলে অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। আবার অনেকে রাখেন, কারণ তাদের সন্তানরা দেশের বাইরে পড়ালেখা করে। এতে তাদের পড়ালেখার খরচ জোগান দেওয়া সহজ হয়। তবে সবাই যে এমন ধোয়া তুলসি পাতা নন, তা তিনি স্বীকার করেছেন। সুইস ব্যাংকে কারা টাকা রাখেন তা জানা সম্ভব নয়, কারণ সে দেশের আইন অর্থ জমাদানকারীদের সব ধরনের তথ্য গোপন রাখার নিশ্চয়তা দিয়েছে। জমাকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনাও সম্ভব নয়। পানামা পেপারস যখন প্রকাশিত হলো, তখন সেই ফাঁস হওয়া দলিলে বাংলাদেশের বেশ কিছু ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদের নাম ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল জিয়া পরিবারের প্রায় সব সদস্যের নাম। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদক বলেছিল- ঘটনা যদি সত্য হয়, তাহলে সেই অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে। এরপর আর কোনও কিছু শোনা যায়নি।
বাংলাদেশ অথবা যে কোনও দেশ হতে বিদেশে অর্থ পাচার হওয়ার অর্থই হচ্ছে দেশের সম্পদ তথা জনগণের অর্থ আর দেশের মূলধন দেশের বাইরে চলে যাওয়া, যার ফলে দেশের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি হয়। কোনও কোনও পাচারবান্ধব অর্থনীতিবিদ আর বিশ্লেষক বলেন, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই বলে এভাবে দেশের অর্থ বাইরে পাচার হয়। তারা কখনও স্বীকার করেন না বর্তমানে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ অন্য যে কোনও সময়ের তুলনায় অনেক ভালো। দেশের প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের খুশি করার জন্য কত না ছাড় দেন। যেদিন ২০১৯-২০ বাজেট সংসদে পাস হবে, সেদিন বোঝা যাবে ব্যবসায়ীদের কতভাবে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই তো গেলো ব্যবসায়ীদের কথা। সুইস ব্যাংকে যে অর্থ জমা হয়, সব কি ব্যবসায়ীদের? সরকারি চাকরিজীবীরা দুর্নীতির মাধ্যমে যে অর্থ আয় করেন, তাদের কি কোনও অর্থ জমা হয় না? অথবা যে সরকারি কেরানি মাস শেষে পঁচিশ হতে ত্রিশ হাজার টাকা বেতন পান তিনি কীভাবে অস্ট্রেলিয়া আর কানাডায় কোটি ডলারের বাড়ি কেনেন? কানাডার টরেন্টোতে একটি বেগম পাড়া আছে। সেই পাড়ায় যে বেগমরা রাজসিক জীবন-যাপন করেন, সেই অর্থ কোথা হতে আসে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া অথবা দুবাই, লন্ডন, নিউইয়র্কে যারা বেগম আর বাচ্চাদের রাখার জন্য বাড়িঘর কিনেছেন, তাদের কতজন বৈধ উপায়ে তা করেছেন। এটি সত্য, সেসব দেশে অনেক বাঙালি পরিশ্রম করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের কথা আলাদা। একবার আমার এক বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র থেকে জানতে চেয়েছিল, তার পরিচিত সরকারের একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার ছেলে তাদের রাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ খরচে পড়তে এসেছে। এটি কীভাবে সম্ভব হলো? তাকে বলেছি আমার পক্ষে আঁচ করা সম্ভব, সত্যটা বলতে পারবে ওই ব্যক্তি।
সুইস ব্যাংকে এশীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা পড়ে ভারত থেকে, যেহেতু ভারতের অর্থনীতির পরিমাণ অনেক বড়। সেই দেশের সরকার এই অর্থ পাচার বা জমা ঠেকানোর জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ যে কার্যকর কিছু করতে পারবে, তা মনে হয় না। সিঙ্গাপুর হতে বেগম জিয়ার পুত্র আরাফাত রহমানের অবৈধ অর্থ আনতে শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। তাও সেই দেশের আদালতের নির্দেশে। তারেক রহমানেরটা এখনও সম্ভব হয়নি। ২০০৭ থেকে এই তারেক রহমান কীভাবে লন্ডনের মতো শহরে সপরিবারে বিলাসী জীবন-যাপন করেন, সেটা রহস্যাবৃত। তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। বৈধভাবে কোনও ব্যবসা বা চাকরি করতে পারেন না। তার বিলাসী জীবন-যাপনের জন্য অর্থ কোথা হতো আসে, সেই প্রশ্ন তো আসতেই পারে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের বেশিরভাগই কালো টাকা, সেটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ব্যবসায়ীরা তা ওভার আর আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার করেন। পাচার করার একটি বড় মাধ্যম হুন্ডি। দেশের প্রতি মায়া থাকলে এই পাচারকারীরা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন না। সবকিছুর জন্য দেশের মানুষ মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি তো কোনও জাদুকর নন যে সব সমস্যা সমাধান তার কাছেই আছে। তাহলে এত সভা পারিষদ রেখে লাভ কী। অর্থ পাচারের বর্তমান ধারা চালু থাকলে আগামী বছর এর পরিমাণ বাড়বে বৈ কমবে না। তবে দেশের মানুষ হয়তো সুইস ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য হতে ওই দেশের ব্যাংকে কত টাকা জমা হয়েছে তার একটা ধারণা পাবে। কিন্তু অন্য দেশে কত টাকা পাচার হলো তার হিসাব কখনো মিলবে না। এই পাচারকারীরাই দেশে এবং দেশের বাইরে সব সময় ভালো থাকেন, আর সমাজের সর্বক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়ান। এই সংস্কৃতি বন্ধ করা হয়তো সম্ভব হবে না, কিন্তু লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। তার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৎ ও দেশপ্রেমী মানুষ দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। তার ব্যত্যয় হলে একটি দেশ দেউলিয়া হওয়ার দিকে ধাবিত হয়। (সংগৃহীত)

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক। শিক্ষক, ইউল্যাব

চেক করুন

বিভ্রান্ত হওয়া না হওয়া

বিভ্রান্ত হওয়া না হওয়া

মুহম্মদ জাফর ইকবাল যতই আমার বয়স বাড়ছে আমি ততই নিজের ভিতর একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। …

ধর্ষক কারা?

ধর্ষক কারা?

রাশেদা রওনক খান ধর্ষক তৈরির কারখানা তো আমাদের পরিবারেই। বেশ কয়েক মাস আগে লিখেছিলাম, ‘সাবধান, …