পবিত্র আশুরা : আমল ও তাৎপর্য – ABNWorld
ঢাকা । মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ই সফর, ১৪৪২ হিজরি
হোম / মতামত / পবিত্র আশুরা : আমল ও তাৎপর্য

পবিত্র আশুরা : আমল ও তাৎপর্য

পবিত্র আশুরা : আমল ও তাৎপর্য

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

হিজরি সালের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখ ইতিহাসে আশুরা নামে সমধিক পরিচিত। মহররম মানে মর্যাদা প্রাপ্ত আর আশুরা অর্থ হল, দশ। মহররমকে হাদিসের ভাষায় আল্লাহর মাস (শাহরুল্লাহ) অভিধায় অভিহিত করা হয়। পুরো মাসটিই সম্মানিত ও পবিত্র। মহররম মাসের ১০ তারিখ আল্লাহ তায়ালা বনি-ইসরাঈল সম্প্রদায়ের ওপর অনুগ্রহ করেন এবং ভবিষ্যতেও তিনি এদিনে অনেক সম্প্রদায়ের ওপর অনুগ্রহ করবেন। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডসহ ইতিহাসের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এই মাসে এই দিনে সংঘটিত হয়। এই দিনের ফজিলত ও মাহাত্ম্য হাদিসে রাসুল (সা.) ও যুগ পরম্পরায় বুজুর্গানে দ্বীনের নেক আমল দ্বারা সুপ্রমাণিত।
রমজানের রোজার পূর্বে আশুরার রোজা ছিল ফরজ। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়। মহানবী (সা.) নবুয়ত লাভের পূর্বে আশুরার রোজা পালন করতেন। জাহিলিয়্যত যুগে মক্কার কুরাইশগোষ্ঠীর সদস্যগণ নিয়মিত আশুরার রোজা পালনে অভ্যস্ত ছিলেন। মহানবী (সা.) বলেন, রমজানের রোজার পর আল্লাহর মাস মহররমের রোজাই হল শ্রেষ্ঠ রোজা এবং ফরজ নামাজের পর রাতের নামাজই (তাহাজ্জুদ) হল শ্রেষ্ঠ নামাজ (মুসলিম : ২৬২২)।
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনায় আগমনের পর লক্ষ্য করলেন আশুরার দিন ইহুদিরা রোজা রাখছে। তিনি এর কারণ জানতে চাইলে তারা উত্তর দিল, আশুরা একটি বড় দিন। এই দিনে আল্লাহ তায়ালা হজরত মূসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দান করেন এবং ফিরআউন ও তার অনুসারীদেরকে ধ্বংস করে দেন। হজরত মূসা (আ.) ওই দিন রোজা রাখতেন এবং আমরা ওই দিনকে স্মরণ করে রোজা রাখি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের তুলনায় হজরত মূসা (আ.) এর ব্যাপারে আমাদের হক বেশি এবং তিনি আমাদের অধিক নিকটবর্তী। অতঃপর মহানবী (সা.) আশুরার দিন নিজে রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদের পালন করার নির্দেশ দেন। এই ব্যাপারে তিনি তার অনুসারীদের উৎসাহিত করতেন এবং খোঁজখবর নিতেন। সাহাবাগণ বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই দিনকে তো ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ সম্মান করে! তখন মহানবী (সা.) বলেন, যদি আমি আগামী বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকি নিশ্চয় আমি নবম তারিখও রোজা রাখব (মেশকাত : ১৯৪৩)।
পরবর্তী মহররম পর্যন্ত আল্লাহর রাসুল (সা.) জীবিত ছিলেন না। তথাপি নবম তারিখসহ মিলিয়ে দুটি রোজা পালন করা সুন্নত। কারণ তিনি রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আল্লামা ইবন হুমামের মতে দশ তারিখের সঙ্গে পূর্বের একদিন অথবা পরের একদিন মিলিয়ে রোজা রাখা মুস্তাহাব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ৪টি নেক আমল সব সময় পালন করতেন। এগুলো কখনও পরিত্যাগ করেননি। সেগুলো সুন্নতে মুয়াক্কাদার পর্যায়ভুক্ত। যেমন- ১. আশুরার রোজা; ২. জিলহজ মাসের ৯টি রোজা; ৩. প্রতি মাসের ৩টি রোজা এবং ৪. ফজরের নামাজের পূর্বে ২ রাকাত সুন্নত (নাসায়ি সূত্রে ফয়জুল কালাম : ৪০০ পৃ)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি অতীতের এক বছরের সব গুনাহ তিনি ক্ষমা করে দেবেন। যে ব্যক্তি মহররম মাসের একদিন রোজা রাখে, তাকে প্রতিদিনে এক মাসের রোজার পুণ্য দেয়া হয় (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ৩/১৩৫)।
আশুরার দিন পরিবারের সদস্যদের জন্য মুক্তহস্তে ব্যয় করা এবং উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করার একটি রেওয়াজ নেককার ও বুজুর্গানে দ্বীনের আমল হিসেবে সমাজে চালু রয়েছে। এই ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একটি হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিন আপন পরিবার-পরিজনের জন্য মুক্তহস্তে ব্যয় করে, আল্লাহ তায়ালা পূর্ণ এক বছর তাকে স্বচ্ছলতা দান করবেন (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ৩/১৩৭)।
হজরত সুফিয়ান সাওরি বলেন, আমি এটা পরীক্ষা করে বাস্তব প্রমাণ পেয়েছি। আশুরা দিবসে পৃথিবীতে বহু দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। দুঃখ ও মুসিবত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তায়ালার সাহায্য চাওয়া প্রয়োজন। শায়খ শিহাবুদ্দীন ইবন হাজর হাইছামী (রহ.) এর মতে ওই দিন বেশি বেশি ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজেউন পড়া উত্তম।
৯ ও ১০ মহররম দিনে ও রাতে স্বাভাবিক নিয়মে নামাজ ও জিকির আজকারে মশগুল থাকা বাঞ্ছনীয়। ভারতের মুফতিয়ে আজম আল্লামা মুফতি কিফায়তুল্লাহ দেহলভী (রহ.) বলেন, আশুরাকে কেন্দ্র বিশেষ কোন পদ্ধতিতে বা বিশেষ কোন নামাজ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয় (কিফায়াতুল মুফতি : ৪/২৫১-২৫২)।

আশুরায় গুরুত্বর্পূ ৩ আমল
হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। মুসলিম উম্মাহর কাছে এই দিন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়ত ও ইতিহাস উভয় বিবেচনায় মাসটি তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসের অনেক অনুপ্রেরণামূলক ঘটনার সাক্ষী এই মহররম মাস। শুধু উম্মতে মুহাম্মদিই নয় বরং পূর্ববর্তী অনেক উম্মত ও নবীর অবিস্মরণীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এই মাসে।

মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই মাসকেন্দ্রিক অনেক কুসংস্কার, ভুল বিশ্বাস ও কাজের চর্চা রয়েছে মুসলিম সমাজে; যার বৃহদংশই ভিত্তিহীন। ভিত্তি রয়েছে এমন ৩টি আমল নিম্নে তুলে ধরা হল-

রোজা রাখা
আশুরার দিনে আমল হিসেবে ৩টি কাজ করা যায়। প্রথমত, রোজা রাখা। এই আমল সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আশুরা উপলক্ষে ২ দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। মহররমের ১০ তারিখের আগে বা পরে এক দিন বাড়িয়ে রোজা রাখার কথা হাদিস শরিফে এসেছে। তবে আশুরার সাথে এর আগের দিন অর্থাৎ ৯ তারিখে রোজা রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন নবী করিম (সা.) নিজে। ফলে ইসলামে আশুরার রোজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এই আশুরার রোজা ফরজ ছিল।
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) আমাদের (রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে) আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। আর এই বিষয়ে তিনি নিয়মিত আমাদের খবরাখবর নিতেন। যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হল তখন আশুরার রোজার ব্যাপারে তিনি আমাদের নির্দেশও দিতেন না, নিষেধও করতেন না। আর এই বিষয়ে তিনি আমাদের খবরাখবরও নিতেন না (মুসলিম, হাদিস : ১১২৮)।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) আশুরা ও রমজানের রোজা সম্পর্কে যেরূপ গুরুত্বারোপ করতেন অন্য কোন রোজা সম্পর্কে রাসুলকে (সা.) সেরূপ গুরুত্ব প্রদান করতে দেখিনি (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০০৬, মুসলিম, হাদিস : ১১৩২)।

পরিবারের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করা
আরেকটি আমল বর্ণনা সূত্রে দুর্বল হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হল, আশুরার দিনে যথাসাধ্য খাবারে প্রশস্ততা প্রদর্শন করা। যথাসম্ভব ভাল খাবার খাওয়া। হজরত আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারে প্রশস্ততা প্রদর্শন করবে, সে সারা বছর প্রশস্ততায় থাকবে (তাবরানি, মুজামে কবির, হাদিস : ১০০০৭; বায়হাকি, হাদিস : ৩৭৯৫)।
এই হাদিসের বর্ণনা সূত্রে দুর্বলতা আছে। তবে ইবনে হিব্বানের মতে, এটি হাসান বা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের হাদিস। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর দাবি, রিজিকে প্রশস্ততার ব্যাপারে কোন হাদিস নেই। এটি ধারণাপ্রসূত। ইমাম আহমদ (রহ.) বলেছেন, এটি বিশুদ্ধ হাদিস নয়। তবে এই বিষয়ে একাধিক বর্ণনা থাকার কারণে হাসান হওয়া অস্বীকার করা যাবে না। আর হাসান লিগাইরিহি পর্যায়ের হাদিস দ্বারা আমল করা যায় (আস-সওয়াইকুল মুহরিকা আলা আহলির রফজি ওয়াদ দালাল ওয়াজ জানদিকা : ২/৫৩৬)।

নবীর পরিবারের জন্য দোয়া পাঠ করা
আরেকটি আমল যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হল, আহলে বাইত তথা নবী করিম (সা.) এর পরিবারের সদস্যরা শাহাদাতের কারণে তাদের জন্য দোয়া করা, দরুদ পড়া এবং তাদের কাছ থেকে সত্যের ওপর অটল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করা। এই ৩টি কাজ ছাড়া আশুরায় অন্য কোন আমল নেই।
স্মরণ রাখতে হবে, ইসলামের ইতিহাসে মহররম মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিভিন্ন কারণে। প্রাক-ইসলামী যুগেও মহররমের ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসের অসংখ্য কালজয়ী ঘটনার জ্বলন্ত সাক্ষী পুণ্যময় এ মাস। আর কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিও আশুরার দিনে সংঘটিত হওয়ায় পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। রচিত হয়েছে শোকাভিভূত এক নতুন অধ্যায়। কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনাই আশুরার একমাত্র ও আসল প্রেরণার উৎস নয়। তাই আশুরা মানেই কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা নয়, আশুরার ঐতিহ্য আবহমানকাল থেকেই চলে আসছে।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, জাহেলি যুগে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকেরা আশুরার রোজা রাখত এবং রাসুলও (সা.) আশুরার রোজা রাখতেন (সহিহ মুসলিম : ২৬৩২)। কাজেই আশুরার সুমহান ঐতিহ্যকে কারবালা দিবসের ফ্রেমে বন্দি করা শুধু সত্যের অপলাপই নয়, একই সাথে দুরভিসন্ধিমূলকও!

প্রসঙ্গত আশুরা উপলক্ষে মহররমের নবম দিনের রোজা রাখার জন্য আজ শনিবার দিবাগত রাতে সাহরি গ্রহণ করতে হবে। নবী করিম (সা.) এর নির্দেশ আনুযায়ী- আমরা যারা আশুরায় ২টি রোজা রাখব তারা আজ রাতে সাহরি গ্রহণ করবো ইনশাল্লাহ।(সংগৃহীত)

চেক করুন

দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভাল কিছু করার প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর

দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভাল কিছু করার প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর

দেশ ও দেশের জনগণের জন্য ভাল কিছু করে যাওয়ার আকাঙ্খা ও প্রত্যাশা পুণর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী …

দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়াল ৫ হাজার

দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়াল ৫ হাজার

দেশে করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৫ হাজার ১৯৩ জনের মধ্যে ৪ হাজার ১৮ জনই …